ব্যতিক্রমের উদ্যোগে আয়োজিত “ব্যতিক্রম আন্তর্জাতিক লেখক সম্মেলন ৪.০” সফলভাবে সমাপ্ত-গুয়াহাটিতে চারদিন জুড়ে বৈশ্বিক সাহিত্যচর্চার মহাসম্মিলন

ব্যতিক্রম গ্রুপের উদ্যোগে আয়োজিত “ব্যতিক্রম আন্তর্জাতিক লেখক সম্মেলন ৪.০” চারদিনের সমৃদ্ধ ও বৈশ্বিক সাহিত্য-পর্ব শেষে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ২৪ থেকে ২৭নভেম্বর পর্যন্ত গুয়াহাটির বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রজুড়ে অনুষ্ঠিত এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের কবি, লেখক, গবেষক ও সাহিত্যতাত্ত্বিক অংশ নেন। সঙ্গে ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও শতাধিক কবি-সাহিত্যিকের উপস্থিতি এ আয়োজনকে এক গভীর আন্তঃসাংস্কৃতিক মিলনমেলায় পরিণত করে।

বিদেশি প্রতিনিধিদের মধ্যে থাকছেন মারিয়া মিস্ত্রিওতি (গ্রীস), ড° আলি আল-শালাহ (ইরাক), ড° মার্ক উইলিয়াম ম্যাকলাউড (অস্ট্রেলিয়া), ড’ অ্যালিস এম. সান-কুয়া (ফিলিপাইন), ত্রান হু ভিয়েত (ভিয়েতনাম), আহমেদ বেন আমর জাাবার (তিউনিসিয়া/যুক্তরাজ্য), ড° স্টেফান আলেক্সান্দ্র বাইসানু (রোমানিয়া), প্রফেসর বোর্দিনাউ কাতালিন ইয়ন (রোমানিয়া), পেদ্রো এনরিকেজ মার্টিনেজ (স্পেন), এবং বাংলাদেশের বিশিষ্ট কবি আমিনুর রহমান।

ভারত থেকে উপস্থিত থাকবেন প্রফেসার স্মৃতি কুমার সিংহ, সুস্মিতা নাথ, সোমা গুপ্তা, লক্ষীন্দ্রর সিংহ, অশোক চক্রবর্তী, বিকাশ সরকার, নিশুতি মজুমদার, সুস্মিতা মজুমদার, প্রফেসর ড° সুমন গুণ সহ একশোরও অধিক কবি সাহিত্যিক।

প্রথম দিন অর্থাৎ ২৪ তারিখের সূচনায় আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের উষ্ণ অভ্যর্থনা এবং ভূপেন হাজারিকা সমাধিক্ষেত্র পরিদর্শন করে, সন্ধ্যায় সোনাপুরের মেফেয়ার স্প্রিং ভ্যালিতে মির্চির সহযোগিতায় আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক অতিথি এবং অসমের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ও প্রতিষ্ঠিত কবি-সাহিত্যিকদের সম্মান প্রদান করা হয়। তারপর গভীর রাতে জুবিন গার্গের সমাধিক্ষেত্র পরিদর্শন করে কবি- সাহিত্যিকদের মনে গভীর আবেগ ও অনুপ্রেরণার সঞ্চার করে। প্রথম দিনের এই সাফল্যই সম্মেলনের পরবর্তী দিনগুলোর জন্য উজ্জ্বল আবহ তৈরি করে।

দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ ২৫ তারিখের মূল আয়োজন অনুষ্ঠিত হয় নেডফি প্রেক্ষাগৃহে। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দিল্লিস্থ বাংলাদেশের হাইকমিশনার এম. রিয়াজ হামিদুল্লাহ। অনুষ্ঠান সম্পর্কে তিনি বলেন, “প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হতে পেরে আমি গভীরভাবে সম্মানিত। এই সম্মেলন শুধু সাহিত্যচর্চার আদান-প্রদান নয়-এটি বহু সংস্কৃতি, ভাষা ও মানবিক অভিজ্ঞতাকে একসূত্রে বাঁধার এক অসাধারণ উদ্যোগ। উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রাণবন্ত সাহিত্য পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ এ আয়োজনকে এক নতুন উচ্চতা দিয়েছে। ব্যতিক্রমের এই প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে ভারত-বাংলাদেশ সহ সমগ্র অঞ্চলের সাংস্কৃতিক সহমর্মিতাকে আরও দৃঢ় করে তুলবে।”

তারপর বহুভাষিক আলোচনা, কবিতা পাঠ, নৃত্য ও সংগীত পরিবেশনায় দিনটি হয়ে ওঠে বৈচিত্র্যময়। কবিতা পাঠে অংশগ্রহণ করেন দিলস লক্ষ্মীন্দ্র সিনহা, মানসী সিনহা, পদ্মজা সিনহা (রুবি), সুধন্য সিনহা, সুজিত সিংহ, সমরজিৎ সিনহা, শাহীন আখতার, জুলি কাকতি, দীপক শর্মা, শ্যামলিনা সাইকিয়া, রাজস্মিতা সিংহ, মথুরা সিনহা, নিকি কলিতা, রশ্মিরেখা কাশ্যপ, শিল্পা রায়, চিরঞ্জীব বারোহ, সঙ্গীতা দে রায়, ইলিনা সিনহা, কমলকলি দাস, মহার্ণব ভূঁইয়া, পায়েল দেবনাথ, মনজয়ী শর্মা পাটগিরি, রিমঝিম দে, মীনাক্ষী গোস্বামী, জয়শ্রী আগরওয়াল, বিজন রায় ভৌমিক, সঞ্চিতা রায়, নন্দিতা সিনহা, দীপিকা দেবী কলিতা, দ্রুণিকা দত্ত, ড° বিনীতা দেবী, আয়ান হালদার, সমীর চক্রবর্তী, জিতেন নাথ প্রমুখ। এ দিনই দুটি বই উন্মোচিত হয় জিতেন নাথের নতুন গ্রন্থ “বেঁচে আছি তাই” এবং লক্ষ্মীন্দর সিংহ-এর “Bemused Time”, যা সাহিত্যপ্রেমী ও পাঠকদের মাঝে বিশেষ উৎসাহ সৃষ্টি করে। দিনটির পরবর্তী পর্বে জীবন রাম মুংগী দেবী ট্রাস্টের পক্ষ থেকে সমাজকর্মী শংকরলাল গোয়েংকা আন্তর্জাতিক লেখক এবং ভারতীয় কবি-সাহিত্যিকদের সম্মাননা প্রদান করেন। ব্যতিক্রম গ্রুপকেও আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধনমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য বিশেষ স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সন্ধ্যায় ব্রহ্মপুত্র হেরিটেজ সেন্টারে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক কবিতা পাঠের আসর সাহিত্যানুরাগীদের এক অনন্য অভিজ্ঞতা উপহার দেন। দ্বিতীয় দিনের শেষভাগে বাংলাদেশ সরকারের সহকারি উচ্চাযুক্ত জিকরুল হাসান ফাহাদ-এর পক্ষ থেকে হোটেল নভোটেল আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের সম্মানে এক নৈশ ভোজের আয়োজন করা হয়। আন্তঃসাংস্কৃতিক বন্ধন সদা করার ক্ষেত্রে এই নৈশ ভোজ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

তৃতীয় দিন অর্থাৎ ২৬ তারিখ গ্রিন ইন্টারন্যাশনাল স্কুল প্রাঙ্গণে আন্তর্জাতিক লেখকদের সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল লেখা, অনুবাদচর্চা, গল্পের ঐতিহ্য ও সাহিত্য-সংলাপকে ঘিরে প্রাণবন্ত ও আন্তরিক মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়। তরুণ শিক্ষার্থীদের উৎসাহী অংশগ্রহণ এবং বিদেশি প্রতিনিধিদের অভিজ্ঞতা বিনিময়ে দিনটি এক অনন্য মননশীল পরিমণ্ডল তৈরি করে, যা ভবিষ্যতের আন্তঃসাংস্কৃতিক সাহিত্য-সংযোগকে নতুন উচ্চতা দেয়। তারপর শিলপুখুরী স্থি “ঐতিহ্য এম্পোরিয়াম” পরিদর্শন করে অসমের হস্তশিল্প ও শৈল্পিক সংস্কৃতির বিষয়ে অতিথিদের জানানো হয়।

সম্মেলনের শেষ দিনে প্রকাশিত হয় একটি বিশেষ সুভেনির, যাতে আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের মতামত, কবিতা, গবেষণামূলক রচনা, ছবি, গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো ও চারবছরের কর্মকাণ্ড সংরক্ষিত হয়েছে। সুভেনির প্রকাশ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে চারদিনের যাত্রার স্মরণীয় দলিল রূপে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। সমাপনী অনুষ্ঠানে দেশি-বিদেশি অতিথিদের সম্মাননা প্রদান, চারদিনের অভিজ্ঞতার সারসংক্ষেপ এবং আগামী আন্তর্জাতিক সাহিত্য-সহযোগিতার দিকনির্দেশনা তুলে ধরা হয়।

অনুষ্ঠান সম্পর্কে আমিনুল রহমান বলেন, “ব্যতিক্রম আন্তর্জাতিক লেখক সম্মেলন ৪.০-এ উপস্থিত হতে পারা আমার জন্য এক বিশেষ অনুভূতি। বিগত চার বছর ধরে এই সম্মিলনের সঙ্গে যুক্ত থেকে আমি দেখেছি-কীভাবে ব্যতিক্রম একটি আঞ্চলিক উদ্যোগ থেকে আন্তর্জাতিক সাহিত্য-সংলাপের এক গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। গুয়াহাটিতে তৈরি হওয়া এই আন্তঃসাংস্কৃতিক পরিবেশ আমাদের ভাবনা, অনুভূতি ও সৃষ্টিশীলতাকে অন্য মাত্রায় উন্নীত করে। বিভিন্ন দেশের লেখকদের সঙ্গে মতবিনিময় শুধু সাহিত্য নয়, মানবিক সম্পর্ককেও নতুনভাবে সমৃদ্ধ করে। এই অনবদ্য আয়োজনের জন্য আমি ব্যতিক্রম গ্রুপের কর্ণধার ড° সৌমেন ভারতীয়া ও গোটা ব্যতিক্রম টিমকে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা জানায়-তাঁদের দূরদৃষ্টি, নেতৃত্ব ও আন্তরিক প্রচেষ্টাই এই সম্মেলনকে আজ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে।”

ব্যতিক্রম গ্রুপের কর্ণধার ড° সৌমেন ভারতীয়া সমাপনী অনুষ্ঠানে বলেন, “এ বছরের লেখক সম্মেলন আন্তর্জাতিক সাহিত্যিকদের ভাবনা, মানবিকতা ও অভিজ্ঞতার এক অসাধারণ মিলনমঞ্চ হয়ে উঠেছে। চারদিনের সাড়া দেখে আমরা উপলব্ধি করেছি ব্যতিক্রম আন্তর্জাতিক লেখক সম্মেলন আজ শুধুমাত্র একটি অনুষ্ঠান নয়, এটি বৈশ্বিক সাহিত্য-সংলাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। আমরা আগামীতেও এই ঐতিহ্যকে আরও বিস্তৃত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।” চারদিনব্যাপী এই আয়োজন উত্তর-পূর্ব ভারতের সাহিত্যচর্চাকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, অনুবাদ-সেতুবন্ধন এবং মানবিক বিনিময়ের এক নতুন দিগন্তে পৌঁছে দিয়েছে। অংশগ্রহণকারী সাহিত্যিকদের মতে, ব্যতিক্রম আন্তর্জাতিক লেখক সম্মেলন ৪.০ এ অঞ্চলের সাহিত্যিক পরিচিতিকে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে আরও দৃঢ়ভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে।

By Business Bureau

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *